কলকাতা টাইমস নিউজ :নিজস্ব প্রতিনিধি :
রেলস্টেশনের কোলাহল। যাত্রীদের ভিড়, হাঁসফাঁস করা গরমের দুপুর। ঠিক এমন সময় এক গর্ভবতী মহিলার চিৎকারে থমকে গেল ঝাঁসি রেলওয়ে স্টেশন। ব্যথায় কুঁকড়ে পড়ে গিয়েছেন তিনি। আশেপাশে কোনও হাসপাতাল নেই। অ্যাম্বুল্যান্স তখনও দূর। সময় একেবারেই হাতে নেই।
এমন পরিস্থিতিতে যিনি সামনে এসে দাঁড়ালেন, তিনি একজন সেনা চিকিৎসক। নিজের পকেট নাইফ আর একটি চুল বাঁধার ক্লিপ দিয়েই রেল প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে এক সদ্যোজাত কন্যার জন্ম দিলেন। সেই ডাক্তার— মেজর ডঃ রোহিত বচ্চওয়ালা (৩১)।
শনিবার দুপুরে পানভেল-গোরখপুর এক্সপ্রেস ট্রেনে যাত্রা করছিলেন এক গর্ভবতী মহিলা। হঠাৎ মাঝপথে প্রচণ্ড প্রসব যন্ত্রণা ওঠে তাঁর। ট্রেন ঝাঁসি স্টেশনে ঢুকতেই তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে নামানো হয়।
উত্তর-মধ্য রেলের ঝাঁসি ডিভিশনের জনসংযোগ আধিকারিক মনোজ কুমার সিং জানিয়েছেন,
“মহিলার অবস্থা খুবই সংকটজনক ছিল। রেলের মহিলা টিকিট পরীক্ষক প্রথম তাকে হুইলচেয়ারে চাপিয়ে আনেন। ঘটনাস্থলে এক সেনা অফিসার ছিলেন, যিনি সাহায্যের জন্য ছুটে আসেন।”
যিনি ছুটে এলেন, তিনি সেনার মেডিক্যাল কর্পস-এর মেজর ডঃ রোহিত বচ্চওয়ালা। তিনি নিজে ঝাঁসি স্টেশনে ট্রেন ধরার অপেক্ষায় ছিলেন। সামনে দেখলেন একজন প্রসব যন্ত্রণায় লুটিয়ে পড়েছেন।
“অপারেশন থিয়েটার তো দূর, বেসিক চিকিৎসার সুবিধাও তখন ছিল না। সময় একদম ছিল না হাতে। আমি নিজের পকেট নাইফ বের করি। একজন মহিলা কনস্টেবলের কাছ থেকে নিই একটা চুলের ক্লিপ,” — জানালেন মেজর বচ্চওয়ালা।
ক্লিপ দিয়ে নাড়ি বাঁধা হয়, আর পকেট নাইফ দিয়ে কাটা হয় সেই নাড়ি। চারপাশে যতটুকু সম্ভব ছিল, হাইজিন বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
তিনি বলেন,
“সব কিছু যেন ঈশ্বরের পরিকল্পনা ছিল। আমি সময়মতো সেখানে পৌঁছেছিলাম বলেই দুটি প্রাণ বাঁচাতে পেরেছি।”
জন্মের পরে মা ও সদ্যোজাত শিশুকে রেল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় অ্যাম্বুল্যান্সে করে স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়। ডাক্তারদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুজনেই এখন স্থিতিশীল।
এত কিছু ঘটার পরেও মেজর বচ্চওয়ালা নিজের ট্রেনে উঠতে ভোলেননি। সময়মতো ট্রেনে উঠে তিনি রওনা দেন হায়দরাবাদের দিকে।
“ডাক্তার হিসেবে আমাদের সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয়। আমি শুধু আমার কর্তব্য করেছি,” বললেন তিনি।
সামাজিক মাধ্যমে ইতিমধ্যেই মেজর বচ্চওয়ালার এই কাজ ভাইরাল হয়েছে। নেটিজেনরা বলছেন—
“এটাই প্রকৃত দেশসেবা। অস্ত্র না, এই ডাক্তার নিজের সাহস আর মন দিয়ে জিতে নিয়েছেন ভারতবাসীর হৃদয়।”
ঝাঁসি রেলস্টেশনে সেই রক্ত-ঘাম-মাটির মধ্যে এক নতুন প্রাণের জন্ম শুধু যে এক মায়ের বাঁচার গল্প বলল তাই নয়, বলল এক সেনা ডাক্তারের তৎপরতা, মানবিকতা ও পেশাদারিত্বের এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
আজকের দিনে, যেখানে হাসপাতালের বাইরেই অনেক সময় প্রাণ চলে যায়, সেখানে একটি চুলের ক্লিপ আর একটি পকেট নাইফ হয়ে উঠল জীবনদায়ী অস্ত্র।




