কলকাতা টাইমস নিউজ :নিজস্ব সংবাদদাতা :
আদিবাসী রাজনীতি ও জনআন্দোলনের এক যুগান্তকারী অধ্যায় শেষ হল সোমবার রাতে। ৮১ বছর বয়সে দিল্লির এক বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়াত হলেন ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার (JMM) প্রতিষ্ঠাতা নেতা শিবু সোরেন। দীর্ঘদিন ধরে কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। জুন মাসের শেষ সপ্তাহে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তাঁর মৃত্যু সংবাদ সামাজিক মাধ্যমে জানিয়ে ছেলে তথা ঝাড়খণ্ডের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন লিখেছেন, “সম্মানীয় দিশোম গুরু আর আমাদের মধ্যে নেই। আজ আমি একেবারে শূন্য হয়ে গিয়েছি।”
শিবু সোরেনের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকের গোড়ায়, যখন তিনি জমি অধিগ্রহণ ও কর্পোরেট শোষণের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের সংগঠিত করেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা’। রাজ্য ভাগের দীর্ঘ আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব ছিলেন তিনি। অবশেষে ২০০০ সালে বিহার থেকে আলাদা হয়ে গঠিত হয় ঝাড়খণ্ড, যার অন্যতম কারিগর ছিলেন দিশোম গুরু।
তিনবার তিনি ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হন—২০০৫ সালের মার্চে, ২০০৮ সালের আগস্ট থেকে ২০০৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এবং ২০০৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১০ সালের মে পর্যন্ত। যদিও কোনওবারই তিনি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। পাশাপাশি ২০০৪ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে তিন দফায় কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রকের দায়িত্বও সামলান। লোকসভায় ছয়বার নির্বাচিত হন, রাজ্যসভাতেও ছিলেন তিনবার।
দেশজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লিখেছেন,
“শ্রী শিবু সোরেন জি ছিলেন মাটির মানুষ, যিনি আজীবন আদিবাসী সম্প্রদায়, গরিব ও বঞ্চিতদের জন্য লড়াই করেছেন। তাঁর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন জির সঙ্গে কথা বলে সমবেদনা জানিয়েছি। ওম শান্তি।”

ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল সন্তোষ কুমার গাঙ্গওয়ার বলেছেন, “আদিবাসী সত্ত্বা ও অধিকারের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর ছিলেন শিবু সোরেন। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
আদিবাসীদের জমি অধিকার, বন ও খনিজ সম্পদের দখল এবং স্বশাসনের দাবি নিয়ে আন্দোলনের রূপকার ছিলেন তিনি। তাঁর জনপ্রিয়তা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে কিংবদন্তির মতো। তাঁকে সম্বোধন করা হতো ‘দিশোম গুরু’ নামে, যার অর্থ ‘জনজাতির মহান নেতা’।
তাঁর নেতৃত্বেই JMM বহু আন্দোলনে শামিল হয় এবং একাধিকবার ঝাড়খণ্ড রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসে। যদিও তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিতর্কহীন ছিল না—চরম সংঘর্ষ, জেলে যাওয়া ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই তাঁর পথচলা ছিল।
তাঁর পুত্র হেমন্ত সোরেন বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী। ছোট ছেলে বাসন্ত সোরেন এবং পুত্রবধূ কল্যাণা মুর্মু সোরেন দু’জনেই ঝাড়খণ্ড বিধানসভার সদস্য। পারিবারিকভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় সোরেন পরিবার এখন তাঁর আদর্শে নেতৃত্ব বহন করছে।
শিবু সোরেন শুধুমাত্র একজন রাজনীতিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক আন্দোলনের প্রাণ। রাজ্য গঠনের এক ঐতিহাসিক সংগ্রামে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অদ্বিতীয়। তাঁর প্রয়াণে ভারতের রাজনীতিতে একটি যুগের অবসান হল। আদিবাসী অধিকারের কণ্ঠস্বর হয়তো স্তব্ধ হয়েছে, তবে তাঁর আদর্শ বহু প্রজন্মকে আন্দোলিত করে যাবে।




