কলকাতা টাইমস নিউজ :
ফাল্গুনী রায়চৌধুরী :
ট্রেনের জানালা দিয়ে ছুটন্ত দৃশ্যের মাঝেই কখনও হঠাৎ ধরা দেয় এমন এক ছবি, যা মনে গেঁথে যায় বছরের পর বছর। কখনও তা হতে পারে কোনো ছোট্ট স্টেশন, কখনও আবার এক ঝলকে দেখা সবুজ টিলা বা দূরের পাহাড়। গয়া যাওয়ার পথে এমনই এক অপূর্ব দৃশ্য হল গুরপা পাহাড়—যার মাথায় ঝলমল করছে সোনালি রঙের একটি বৌদ্ধ স্তূপ।
গুরপা পাহাড়, যার অপর নাম ‘গুরুপাদগিরি’ বা ‘কুক্কুটপদগিরি’, শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, তার ধর্মীয় গুরুত্বের কারণেও বহু যুগ ধরে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র। লোকে বলে, এখানেই বুদ্ধের অন্যতম প্রধান শিষ্য মহাকশ্যপ চিরনির্বাণ লাভ করেছিলেন। তাই এটি বৌদ্ধদের কাছে এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র।
পাহাড়ে ওঠার গল্প :
গুরপা স্টেশন থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরেই পাহাড়ের পাদদেশ। হেঁটে গেলে গ্রাম্য পথে বর্ষায় বেড়ে ওঠা লতাগুল্ম আর শ্যামলিমা পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবে। তবে যাঁরা গাড়িতে যাবেন, তাঁরা আরও খানিকটা উঁচু পর্যন্ত পৌঁছতে পারবেন। পাহাড়ে ওঠার জন্য বাঁধানো সিঁড়ি—শোনা যায়, প্রায় ১৮০০ ধাপ পেরোতে হয়। যত উপরে উঠবেন, ততই চোখে পড়বে আশেপাশের অরণ্য আর মেঘমাখা দিগন্ত।
কিন্তু শেষ দিকে আসল চ্যালেঞ্জ—পাথরের সরু ফাটল! এমন গুহামতো ফাঁক দিয়ে শরীর কায়দা করে উঠতে হয়। যাঁদের ক্লস্ট্রোফোবিয়া আছে, তাঁদের জন্য এই অংশ একটু কষ্টকর হতে পারে। তবে ফাটল পেরোতেই মিলবে পুরস্কার—ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা, দিগন্তজোড়া দৃশ্য আর পাহাড়ের মাথায় সোনালি চোর্তেনের নীরব মহিমা।
চূড়ার সৌন্দর্য ও ধর্মীয় আবহ :
চূড়ায় রয়েছে মহাকশ্যপের ধ্যানরত মূর্তি, চারপাশে রঙিন প্রার্থনার পতাকা, আর দু’টি ছোট মন্দির। প্রতি বছর শ্রাবণ মাসে এখানে বিশেষ মেলার আয়োজন হয়। বাকি সময়ে জায়গাটি থাকে নিরিবিলি, শুধুমাত্র কিছু স্থানীয় মানুষ ও মাঝে মাঝে আগত ভক্তদের পদচারণায় মুখর।
বুদ্ধ গয়ার পথ :
গুরপা পাহাড় থেকে বুদ্ধ গয়া যাওয়ার দুটি রাস্তা আছে—রাজৌলি হয়ে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরত্ব। বুদ্ধ গয়া শুধু বৌদ্ধ তীর্থ নয়, তার স্থাপত্য ও পরিবেশও মনমুগ্ধকর। এখানে আছে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্বীকৃত মহাবোধি মন্দির, মহাবোধি বৃক্ষ, ৮০ ফুট উঁচু বুদ্ধমূর্তি, এবং ২০টিরও বেশি দেশভিত্তিক বৌদ্ধ মন্দির—যার স্থাপত্য একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
যাতায়াত ও থাকা :
হাওড়া থেকে গয়া যাওয়ার অসংখ্য ট্রেন আছে—হাওড়া-জোধপুর সুপারফাস্ট, বন্দে ভারত এক্সপ্রেস ইত্যাদি। গুরপা পাহাড়ের আশেপাশে থাকার সুযোগ সীমিত, তাই বুদ্ধ গয়া বা গিরিডিতে থাকা ভালো।
স্বল্পচেনা এই পাহাড় শুধু পর্যটনের জন্য নয়, ইতিহাস, লোককথা ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে এক অনন্য গন্তব্য। পাহাড়ের সরু ফাটল পেরিয়ে যে শান্তি ও দৃশ্যপট মিলবে, তা ভোলার নয়—এ যেন প্রকৃতি আর ধর্মের মিলিত উপহার।




