কলকাতা টাইমস নিউজ :
ঠিক এক বছর আগে কলকাতার বুকে ঘটেছিল এক জঘন্য ও নারকীয় ঘটনা। চিকিৎসা জগতের গর্ব, তরুণী চিকিৎসককে প্রাণ হারাতে হয়েছিল আর.জি. কর মেডিক্যাল কলেজের প্রাচীরের ভিতরে। সেই অমানবিক হত্যাকাণ্ড কেবল একজন চিকিৎসকের জীবনই কেড়ে নেয়নি, কেঁপে উঠেছিল গোটা রাজ্য, স্তম্ভিত হয়েছিল দেশ। আজ, সময়ের স্রোতে এক বছর পেরিয়ে এসে, সেই অন্ধকার দিনের স্মৃতি ফিরে দেখা—“অভয়া”। কলমে দেবজিৎ গাঙ্গুলী।
ঠিক এক বছর আগে, ২০২৪ সালের ১৪ অগস্ট মধ্যরাতে পশ্চিমবঙ্গ সাক্ষী হয়েছিল এক নজিরবিহীন প্রতিবাদের। আরজি কর হাসপাতালে কর্মরত এক তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার বিচার দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিলেন অসংখ্য মানুষ। নাম দেওয়া হয়েছিল আন্দোলনের— ‘রাত দখল’। ফুলকি থেকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল প্রতিবাদের আগুন।
নারী, পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গ—সবার কণ্ঠে একটাই স্লোগান: অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকা থেকে সাধারণ মানুষ—সবাই হয়েছিল সমান সোচ্চার।
কিন্তু বছর ঘুরে আজ, ১৪ অগস্ট ২০২৫-এ, আবারও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ডাকা হয়েছে ‘রাত দখল’-এর কর্মসূচি। কলকাতা, যাদবপুর, অ্যাকাডেমি চত্বর—সহ নানা জায়গায় মশাল জ্বালিয়ে রাতের আকাশে ধ্বনিত হবে প্রতিবাদের স্লোগান। তবু প্রশ্ন উঠছে—এবারও কি মিলবে আগের মতো সাড়া, নাকি প্রতিবাদের আগুন কিছুটা নিভে এসেছে?
গত বছরের আন্দোলনে সামাজিক মাধ্যমের শক্তি ছিল বিরাট। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী রিমঝিম সিনহার দেওয়া আহ্বান ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ-বিদেশে। লক্ষাধিক লাইক, শেয়ার, ভিডিও ভিউ—সব মিলিয়ে তা হয়েছিল এক ঐতিহাসিক ডিজিটাল জনজোয়ার।
কিন্তু এবারের ছবিটা ভিন্ন। চলতি বছরের ৬ অগস্টে রিমঝিম আবারও ডাক দিলেও, ১৩ অগস্ট রাত পর্যন্ত তাঁর পোস্ট শেয়ার হয়েছে মাত্র ১০ বার, লাইক ১০৭টি। বড় তারকাদের ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামেও ‘রাত দখল’-এর পোস্ট তেমন চোখে পড়ছে না।
অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় ১২ অগস্টে সুপ্রিম কোর্টের পথকুকুর সরানোর বিষয়ে লিখেছেন, কিন্তু ‘রাত দখল’ প্রসঙ্গে নীরব। অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী ও সোহিনী সরকার—দুজনের সামাজিক মাধ্যমেও নেই এ নিয়ে সরাসরি পোস্ট।
গায়িকা লগ্নজিতা চক্রবর্তী বর্তমানে বেঙ্গালুরুতে, আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন। তাঁর কথায়, “প্রাপ্তি একটাই—আমাকে চুপ থাকতে হবে।” নাট্যব্যক্তিত্ব সোহিনী সেনগুপ্তের মতে, “শুরুটা ছিল সঠিক পথে, কিন্তু পরে রাজনীতি ঢুকে গিয়েছিল, তাই আমি দূরত্ব নিয়েছি।”
তবুও সংগঠকদের আশা, আন্দোলনের মূল সুর—মহিলাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস—এখনও টিকে আছে। রিমঝিমের মতে, “রাত দখল আসলে মহিলাদের শিখিয়েছে কিভাবে এলাকায় এলাকায় সংগঠিত হতে হয়।”
শতাব্দী দাশ, আরেক গুরুত্বপূর্ণ মুখ, জানান, “গত এক বছরে সরকারের কাছে বারবার দাবি জানিয়েছি, কিন্তু তিলোত্তমার বিচার এখনও হয়নি। তবে মেয়েরা এখন পরিবারে, সমাজে ও আন্দোলনে আরও দৃঢ় কণ্ঠে নিজেদের কথা বলছে।”
আজকের রাতে কি ফের দেখা যাবে গত বছরের মতো মানুষের ঢল? নাকি সাড়া মিলবে সীমিত পরিসরে? রাত গড়ালেই তার উত্তর দেবে রাজপথ—যেখানে আজও জ্বলবে প্রতিবাদের মশাল।




