কলকাতা টাইমস নিউজ : কলকাতা, ১৫ অগস্ট:
বিস্তারিত দেবজিৎ গাঙ্গুলির কলমে :
এক বছর আগের রাতের সেই দৃশ্য আজও অনেকের মনে অমলিন— ধর্ম, জাত, দল বা মতের বিভাজন ভুলে, বাংলার মানুষ এক সুরে রাস্তায় নেমেছিল। হাতে ছিল জ্বলন্ত মশাল, মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল একটাই দাবি— “উই ওয়ান্ট জাস্টিস”। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে গত বছর ১৪ অগস্ট রাত থেকেই শুরু হয়েছিল এক নজিরবিহীন গণআন্দোলন, যার নতুন অভিধা হয়েছিল— “রাত দখল”।
এক বছর কেটে গেছে। মাঝে এই স্লোগান হারিয়ে গিয়েছিল রাস্তাঘাট থেকে, কিন্তু স্বাধীনতা দিবসের আগের রাত ফের বাংলার গলি থেকে রাজপথে ফিরে এল সেই আওয়াজ। যদিও আন্দোলনকারীদের একাংশের স্বীকারোক্তি, এবার তেজ কিছুটা কমেছে, ভিড়ও কিছুটা সীমিত ছিল।দেখা যায়নি সেই মানুষের সমাগম ,কার্যত ৮বি থেকে শ্যামবাজার মানুষের সংখ্যা ছিল একেবারেই কম ,এক কোথায় ১৪ অগাস্ট ২০২৪ এর তুলনায় প্রায় কিছুই নয় বলা যেতেই পারে।
আদালতের রায়ে এই ঘটনার একমাত্র অভিযুক্ত সঞ্জয় রায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেও, অনেকেই মনে করেন “প্রকৃত বিচার” এখনও হয়নি। বৃহস্পতিবার রাত থেকে কলকাতার শ্যামবাজার, যাদবপুর, রাসবিহারী, সিঁথি মোড় থেকে শুরু করে নদিয়ার কৃষ্ণনগর, কোচবিহারের দিনহাটা— সর্বত্রই রাত জেগে মানুষ প্রতিবাদে সামিল হন।
কোথাও তৈরি হয় অস্থায়ী মঞ্চ, কোথাও আবার খোলা রাস্তায় পথনাটিকা, গান ও কবিতায় চলতে থাকে আন্দোলন। যাদবপুরে জ্বলন্ত মশাল হাতে মিছিল বের হয়। রাস্তা জুড়ে লেখা হয় প্রতিবাদের স্লোগান, আঁকা হয় প্রতীকী ছবি।
গত বছরের মতো এবারও আন্দোলনের মঞ্চে ছিলেন চিকিৎসক, অভিনেতা, সংস্কৃতিকর্মীরা। রাসবিহারীতে দেখা গেল জুনিয়র চিকিৎসক দেবাশিস হালদারকে, যিনি গত বছরও আন্দোলনের মুখ ছিলেন। সিঁথির মোড়ের কর্মসূচিতে হাজির ছিলেন চিকিৎসক নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিনেতা পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
অভিনেতা চন্দন সেনও বিভিন্ন মঞ্চে উপস্থিত থেকে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ান। সোদপুরে নিহত চিকিৎসকের বাড়ির কাছে অভয়া মঞ্চের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতেও ছিল মানুষের ভিড়।
শুধু কলকাতাই নয়— কৃষ্ণনগর, দিনহাটা, বালিগঞ্জ, অ্যাকাডেমি চত্বর— সর্বত্র একই স্লোগান: “উই ওয়ান্ট জাস্টিস”। এই সমবেত কণ্ঠে মিশে গেছে শহরের ধুকপুকি ও মফঃসলের বেদনা।
শ্যামবাজারে আন্দোলনকারীদের ভিড়ে হাজির ছিলেন নদিয়ার কালীগঞ্জে বোমায় নিহত নাবালিকা তমন্নার মা, সাবিনা ইয়াসমিন। তাঁর কথায়, “গত বছর ওই চিকিৎসক বোনের ঘটনা আমাদের নাড়িয়ে দিয়েছিল। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আমি সন্তানহারা হলাম। এই রাজ্যে আইন কোথায়?” — তাঁর কণ্ঠে মিশে ছিল শোক ও ক্ষোভের মিশ্র সুর।
দুপুরে মৌলালির যুবকেন্দ্রে ন্যায়বিচারের দাবিতে নাগরিক কনভেনশনে জন্ম নিল নতুন সংগঠন— ‘ভয়েস অফ অভয়া – ভয়েস অফ উইমেন’। সভাপতিত্বে ছিলেন ভূবিজ্ঞানী অধ্যাপক ধ্রুবজ্যোতি মুখোপাধ্যায়। উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক দুর্গাপ্রসাদ চক্রবর্তী, কবি শুভ দাশগুপ্ত, নাট্যকার বিভাস চক্রবর্তী প্রমুখ।
জুনিয়র চিকিৎসক দেবাশিস হালদার বলেন, “আজ অভয়া আন্দোলনের এক বছর, একই সঙ্গে আরজি কর হাসপাতালে ভাঙচুরেরও এক বছর, যার দায় কলকাতা পুলিশের।”
এক বছরের ব্যবধানে আন্দোলনের আগুন অনেকটা নিভে এলেও, শিখাটি এখনও জ্বলছে। রাত দখল আন্দোলন ফের মনে করিয়ে দিল— ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে এখনো বোধয় অনেক রাত বাকি ।




