কলকাতা টাইমস নিউজ :নিজস্ব সংবাদদাতা : কলকাতা , ৩ সেপ্টেম্বর :
ঢাকায় মার্কিন বিশেষ বাহিনীর আধিকারিকের রহস্যমৃত্যু, উদ্বেগে ভারতীয় গোয়েন্দারা !
ঢাকার পাঁচতারা ওয়েস্টিন হোটেলের অষ্টম তলার ৮০৮ নম্বর কক্ষে এক মার্কিন সেনা আধিকারিকের দেহ উদ্ধারের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। মৃত সেনা আধিকারিকের নাম টেরেন্স আরভেল জ্যাকসন (বয়স আনুমানিক ৫০)। তিনি মার্কিন সেনার ১ম স্পেশ্যাল ফোর্সেস কমান্ড (এয়ারবোর্ন)-এর কমান্ড ইন্সপেক্টর জেনারেল পদে কর্মরত ছিলেন। প্রাথমিক তদন্তে ঢাকার পুলিশ জানিয়েছে, এটি স্বাভাবিক মৃত্যু বলেই মনে হচ্ছে, কোনো রকম নাশকতার প্রমাণ মেলেনি। তবু বিষয়টি ঘিরে নানাবিধ প্রশ্ন উঠছে ভারতীয় এবং বাংলাদেশের গোয়েন্দা মহলে।
অন্যদিকে মার্কিন সেনার গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, জ্যাকসন নর্থ ক্যারোলিনার রেফোর্ড শহরের বাসিন্দা। ২০০৩ সালে আর্মি ন্যাশনাল গার্ডে যোগ দেওয়ার পর ২০০৬ সালে তিনি যুক্ত হন মার্কিন সেনার সঙ্গে। গত দুই দশকেরও বেশি সময়ে তিনি এশিয়া অঞ্চলে একাধিক যুদ্ধ ও সামরিক দায়িত্বে অংশ নিয়েছেন। তাঁর নিজের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট অনুযায়ী, আগামী দুই বছরের মধ্যেই অবসর নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
ঢাকা পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের এক আধিকারিক জানিয়েছেন—জ্যাকসন ২৯ অগস্ট ওয়েস্টিন হোটেলে চেক-ইন করেন। মাত্র দু’দিন পরেই, ৩১ অগস্ট, তাঁর দেহ উদ্ধার হয় ঘর থেকে। যদিও প্রাথমিকভাবে পুলিশ বলছে স্বাভাবিক মৃত্যু, তবু অবাক করার বিষয় হলো—অটোপসি ছাড়াই দেহ মার্কিন দূতাবাসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
অপরদিকে ভারতীয় গোয়েন্দা মহল মনে করছে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ঢাকায় এক মার্কিন স্পেশ্যাল ফোর্সেস আধিকারিকের উপস্থিতি নিছক ‘ব্যবসায়িক সফর’-এর অজুহাতে চাপা দেওয়া হচ্ছে। তাঁরা খতিয়ে দেখছেন, এই সফরের সময়ে তিনি কার কার সঙ্গে দেখা করেছেন এবং কোন কোন জায়গায় গিয়েছেন।
একজন গোয়েন্দা আধিকারিক বলেন, “এমন একজন উচ্চপদস্থ মার্কিন সেনা আধিকারিক দীর্ঘসময় বাংলাদেশে অবস্থান করবেন, অথচ এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়—এই বিষয়টিই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।”
পাশাপাশি তদন্তকারীরা আরও ইঙ্গিত দিচ্ছেন প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস-এর সাম্প্রতিক সফরগুলির দিকে। বর্তমানে তিনি টেক্সাস-ভিত্তিক কোম্পানি এক্সেলারেট এনার্জির স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভাইজার। গত এক বছরে তিনি অন্তত ছয়বার বাংলাদেশ সফর করেছেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফরগুলিকে ব্যবসায়িক বলা হচ্ছে, ভারত ও বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের সন্দেহ—এতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থও লুকিয়ে রয়েছে।
বিশেষত, গত ৫ অগস্ট কক্সবাজারে পিটার হাস ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্ম (এনসিপি)-এর পাঁচ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে খবর। এই সংগঠনটির যোগ রয়েছে ‘অ্যান্টি-ডিসক্রিমিনেশন স্টুডেন্টস মুভমেন্ট’-এর সঙ্গে, যারা গত বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
ঢাকায় মার্কিন সেনা আধিকারিকের মৃত্যু এবং একইসঙ্গে প্রাক্তন রাষ্ট্রদূতের পুনঃপুন সফর—এই দুই ঘটনা মিলে ভারতীয় গোয়েন্দাদের সন্দেহ আরও গভীর করছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকলাপকে তারা কেবল অর্থনৈতিক কূটনীতি হিসেবে দেখছে না, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
ঢাকার একটি হোটেল কক্ষে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর আধিকারিকের হঠাৎ মৃত্যু শুধু মানবিক ক্ষতি নয়, তা নতুন ভূরাজনৈতিক প্রশ্নও উস্কে দিয়েছে। বাংলাদেশ প্রশাসন হয়তো ঘটনাটিকে সাধারণ মৃত্যু বলেই চিহ্নিত করছে, কিন্তু ভারতীয় গোয়েন্দারা পরিষ্কার জানাচ্ছেন—ঘটনাটি যতটা সরল দেখানো হচ্ছে, তার আড়ালে ততটাই জটিল কূটনৈতিক সমীকরণ লুকিয়ে থাকতে পারে।




