কলকাতা টাইমস নিউজ :নিজস্ব সংবাদদাতা :কলকাতা ,২৮ সেপ্টেম্বর :
শারদীয়া মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব। ভাদ্রের আকাশ যখন মেঘমুক্ত হয়, কাশফুলে ভরে ওঠে মাঠ, শিউলির গন্ধে ভোরের হাওয়া মাখা থাকে—তখনই বাঙালির মন বাজতে থাকে ঢাকের তালে। দুর্গাপূজো কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি সামাজিক মিলন, সাংস্কৃতিক উন্মেষ এবং আবেগের এক অমূল্য পর্ব।
মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ যেন পূজোর শঙ্খধ্বনি। কুমোরটুলির শিল্পীদের হাতের মাটি থেকে যখন গড়ে ওঠে প্রতিমা, তখন প্রতিটি আঙুলে মিশে থাকে ভক্তি, বিশ্বাস আর শিল্পের ছোঁয়া। শহরের অলিগলিতে আলো, বাঁশ, কাপড়, কাঠ আর রঙের খেলায় তৈরি হয় ক্ষণস্থায়ী জাদুঘরসদৃশ প্যান্ডেল। কয়েক দিনের মধ্যেই সেগুলো ভেঙে যায়, কিন্তু স্মৃতির অ্যালবামে রয়ে যায় চিরকাল।
দুর্গাপূজো মানেই মিলনের উৎসব। ঠাকুর দেখতে যাওয়ার পথে হাতে ফুচকা, মুখে আড্ডা আর চোখে আনন্দের ঝিলিক—এই আবহই পূজোর প্রাণ। ভোগের খিচুড়ি-লাবড়া-পায়েস হোক বা কাঠি রোল, বিরিয়ানি আর মিষ্টি—খাবারের মধ্য দিয়েও গড়ে ওঠে ভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধন।
কলকাতার অগ্রগণ্য শিল্পগোষ্ঠী ঘোষ গ্রুপ প্রতি বছরই পূজোর আবহে সামাজিক বার্তা ছড়িয়ে দিতে এগিয়ে আসে। তাঁদের বিশ্বাস—উৎসব মানে কেবল আনন্দ নয়, সবার সঙ্গে সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। তাই পূজোর সময় তাঁরা আয়োজন করেন বস্ত্র ও আহার বিতরণ, স্বাস্থ্য শিবির, প্রবীণদের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কর্মীরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন রক্তদান ও দানশিবিরে। ঘোষ গ্রুপের দর্শন, “সত্যিকারের উৎসব হল সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা।”
চেয়ারপার্সন তনুশ্রী ঘোষ জানালেন—
“দুর্গাপূজো আমাদের আত্মার উৎসব। ধর্ম, জাত বা বয়স—কোনো ভেদাভেদ নেই এখানে। সবাই মিলে শিল্প, সঙ্গীত আর আনন্দে মেতে ওঠে। মিলিত প্রচেষ্টা আর সৃজনশীলতাই পারে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।”
চেয়ারম্যান এমেরিটাস বিশ্বদীপ ঘোষ স্মৃতিমেদুর কণ্ঠে বললেন—
“চার দশক আগে ছোট্ট শুরু করেছিলাম। আজ দেখি, পূজো প্রতি বছর নতুন রূপে ফিরে আসে। এই উৎসব আমাদের শেখায়—শিকড়ে থেকে সময়ের সঙ্গে তাল মেলানোই জীবনের আসল শিক্ষা।”
ম্যানেজিং ডিরেক্টর বিতান ঘোষ নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের কথা বললেন—
“মা দুর্গা যেমন প্রতিবছর ফিরে আসেন, তেমনি আমরাও চাই নতুন উদ্যমে, নতুন স্বপ্ন নিয়ে এগোতে। পূজো আমাদের মনে করায়—আমাদের শক্তি এখানেই, আমাদের সংস্কৃতিতেই।”
প্যান্ডেলের সামনে ধনী-গরিব, ছোট-বড়, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই সমান। পূজোর এই মিলনই বাংলার সম্পদ। স্থানীয় ক্লাবগুলোও শুধু সাজসজ্জা নয়, বরং সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়—রক্তদান শিবির, স্বাস্থ্য শিবির থেকে শুরু করে নারীশক্তি ও শিক্ষার প্রচার।
আজকের পূজো আরও প্রযুক্তিনির্ভর। ড্রোনে ওঠে আকাশদৃশ্য, ইউটিউবে সরাসরি সম্প্রচার দেখে প্রবাসী বাঙালিরাও জুড়ে থাকেন উৎসবে। অর্থনীতিতেও এই উৎসব বিশাল শক্তি—ফ্যাশন, খাবার, হোটেল, ট্রাভেল মিলে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা ঘুরে যায় পূজোর সপ্তাহে। অসংখ্য শিল্পীর জীবিকা নির্ভর করে এই উৎসবের উপর।
মহিষাসুর মর্দিনী শুধু পৌরাণিক কাহিনি নয়, অন্যায় ও অন্ধকারের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের লড়াইয়ের প্রতীক। আজকের সমাজে, যেখানে নানা চ্যালেঞ্জ প্রতিদিন সামনে আসে, মা দুর্গার এই বার্তাই প্রেরণা দেয়—লড়াই করো, জিতবে তুমি।
দুর্গাপূজো মানে দেবীর আরাধনা, কিন্তু তার থেকেও বেশি—জীবনের আরাধনা। এটি আনন্দের, মিলনের, সৃষ্টির উৎসব।




