কলকাতা টাইমস নিউজ :নিজস্ব সংবাদদাতা :কলকাতা :২৩ অক্টোবর
হায়দরাবাদে এক ভয়ঙ্কর জালিয়াতির চক্রের পর্দাফাঁস করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। ‘ইউনিভার্সাল সৃষ্টি ফার্টিলিটি সেন্টার’ নামের একটি বেসরকারি ক্লিনিকের আড়ালে চলছিল শিশু বিক্রি, ডিম্বানু পাচার ও সারোগেসির নামে প্রতারণার কারবার। এই ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন ক্লিনিকের প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক, ডাঃ এ. নম্রতা — যিনি বর্তমানে ইডির হেফাজতে রয়েছেন।
ইডির তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারীদের দাবি, ক্লিনিকটি দরিদ্র ও আর্থিকভাবে দুর্বল মহিলাদের কাছ থেকে খুব কম টাকায় ডিম্বানু কিনে নিত। তারপর সেগুলিকে ‘সারোগেসি’ বা ‘আইভিএফ’-এর প্রয়োজনে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করা হতো। এক-একটি ডিম্বানুর জন্য ৪০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হত — যা শুনে হতবাক তদন্তকারীরাও।
ইডির হাতে পাওয়া নথি বলছে, এই চক্র প্রতারণা ঢাকতে জাল DNA রিপোর্টও তৈরি করত। ফলে সন্তানের জৈবিক উৎস সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন উঠলেই তারা ভুয়ো নথি দেখিয়ে দম্পতিদের ভুল পথে চালিত করত। অনেক ক্ষেত্রেই প্রতারিত দম্পতিরা বুঝতেই পারেননি যে তাঁরা প্রতারণার শিকার।
সূত্রের খবর, ২০১৯ সাল থেকেই হায়দরাবাদ পুলিশের কাছে এই ক্লিনিকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই ইডি অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন (PMLA) অনুযায়ী একটি ইনফোর্সমেন্ট কেস ইনফরমেশন রিপোর্ট (ECIR) নথিভুক্ত করে তদন্ত শুরু করে। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন— প্রতারণার মাধ্যমে এই ক্লিনিক কত টাকা আয় করেছিল এবং সেই টাকার উৎস ও গন্তব্য কোথায় ছিল।
গত মাসেই ইডি তেলঙ্গনা ও অন্ধ্রপ্রদেশের মোট নয়টি জায়গায় — হায়দরাবাদ, বিজয়ওয়াড়া ও বিশাখাপত্তনম-সহ — একযোগে অভিযান চালায়। সেই সব জায়গা থেকে বাজেয়াপ্ত হয়েছে বিপুল পরিমাণ আর্থিক নথি, রশিদ, ও সন্দেহজনক রেকর্ড। তদন্তে জানা গিয়েছে, ডিম্বানু ক্রয়ের অধিকাংশ অর্থই নগদে দেওয়া-নেওয়া হতো। কুরিয়ারের মাধ্যমে নগদ টাকা পাঠানোর প্রমাণও মিলেছে।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই হায়দরাবাদ পুলিশ ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে রয়েছেন কয়েকজন চিকিৎসকও। অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের অধীনে কর্মরত একাধিক চিকিৎসককেও সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। পুলিশ ও ইডি মনে করছে, এই প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় ফার্টিলিটি চক্র দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্যে ছড়িয়ে রয়েছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, এই ফার্টিলিটি ক্লিনিক গত কয়েক দশক ধরে একইভাবে প্রতারণা চালিয়ে এসেছে। নিঃসন্তান দম্পতিদের ‘সন্তানের আশায়’ ব্যবহার করা হয়েছে, আর সেই আবেগকেই টাকার কারবারে পরিণত করেছে একদল অসাধু চিকিৎসক ও দালাল।
বর্তমানে ইডি ডাঃ নম্রতার আর্থিক লেনদেন, বিদেশি অ্যাকাউন্ট ও সম্পত্তির খতিয়ান খুঁটিয়ে দেখছে। সন্দেহ করা হচ্ছে, এই অর্থ পাচার চক্রের সঙ্গে বিদেশি ফার্টিলিটি নেটওয়ার্কেরও যোগাযোগ রয়েছে।
তদন্তকারীরা নাগরিকদের সতর্ক করে বলেছেন — “সন্তান জন্ম বা সারোগেসির মতো সংবেদনশীল বিষয়ের ক্ষেত্রে কোনও ক্লিনিক বা সংস্থার বৈধতা ও লাইসেন্স যাচাই না করে কাউকে বিশ্বাস করবেন না।”
একটি মায়ের কোল ভরানোর আশাকে যদি কেউ পণ্য বানায়, তবে সেটি শুধু অপরাধ নয় — মানবিকতারও অপমান। ইডির এই তদন্ত দেখিয়ে দিল, চিকিৎসার নাম করে কীভাবে একাধিক দম্পতির আশা, স্বপ্ন ও সঞ্চয়কে ব্যবসায় রূপান্তরিত করা হয়েছে।




