কলকাতা টাইমস নিউজ :নিজস্ব সংবাদদাতা :কলকাতা :১১ নভেম্বর
ভারতের রাজধানী দিল্লিকে কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো ভয়াবহ নাশকতার ছক বানচাল করল দেশের গোয়েন্দা সংস্থা। দিল্লির উপকণ্ঠ হরিয়ানার ফরিদাবাদে মিলল বিস্ফোরকের পাহাড়— প্রায় ২৯০০ কেজি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র, বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও ডিজিটাল যোগাযোগ যন্ত্র।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত কয়েক দিনে যৌথ অভিযানে নামেন জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (IB), হরিয়ানা পুলিশ এবং উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন অন্তত ৭ জন সন্দেহভাজন, যাদের মধ্যে রয়েছেন তিনজন চিকিৎসকও।
সম্প্রতি গোয়েন্দাদের হাতে আসে খবর— ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তান-সমর্থিত জঙ্গি সংগঠনগুলি ভারতের মাটিতে বড়সড় হামলার ছক কষছে। সেই তথ্য মিলতেই বাড়ানো হয় নজরদারি।
এর পরেই প্রকাশ্যে আসে এক ভয়ঙ্কর সত্য— জঙ্গি নেটওয়ার্ক infiltrate করেছে উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীদের মাধ্যমে, যাদের বলা হচ্ছে “হোয়াইট কলার টেররিজম”।
তদন্তকারীদের দাবি, এই ছকের নেপথ্যে রয়েছে জৈশ-ই-মহম্মদ (JeM) ও আনসার গাজওয়াত-উল-হিন্দ (AGuH)— আল-কায়দা ঘনিষ্ঠ সংগঠন। যদি এই পরিকল্পনা সফল হতো, তবে তা ২০০৮ সালের মুম্বই বিস্ফোরণ বা ২০০৫ সালের দিল্লি সিরিজ ব্লাস্টের থেকেও ভয়ঙ্কর হতো।
এই নেটওয়ার্কের প্রথম সূত্র আসে শ্রীনগর থেকে। সেখানে নিষিদ্ধ সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদের সমর্থনে পোস্টার লাগানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হয় অনন্তনাগ মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক আদিল আহমেদ রাথের। তাঁর লকার থেকে উদ্ধার হয় AK-47 রাইফেল ও গোলাগুলি।
এই তথ্যের সূত্র ধরে তদন্তকারীরা পৌঁছে যান হরিয়ানার ফরিদাবাদে— যেখানে আল ফালাহ মেডিক্যাল কলেজ-এর চিকিৎসক মহম্মদ শাকিল-এর ঘর থেকে উদ্ধার হয় ৩৬০ কেজি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, ২০টি টাইমার, একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র, ব্যাটারি, রিমোট কন্ট্রোল ও বিস্ফোরক তৈরির সামগ্রী।
চিকিৎসকের বাড়ি থেকে পাওয়া যায় ৮টি বড় স্যুটকেস ও ৪টি ছোট স্যুটকেস, ভর্তি বোমা তৈরির উপকরণ। সাদা অ্যাপ্রনের আড়ালে চলছিল এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র, যা রবিবারের অভিযানের আগে কারও কল্পনাতেও আসেনি।
অভিযানের সময় একটি গাড়ি থেকে উদ্ধার হয় অ্যাসল্ট রাইফেল, ম্যাগাজিন, ৮৩ রাউন্ড গুলি, পিস্তল, ও কার্তুজ। পরে জানা যায়, গাড়িটি ওই চিকিৎসকের সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডাঃ শাহিন শাহিদ-এর। গাড়িটিকে অস্ত্র লুকানোর কাজে ব্যবহার করতেন শাকিল। তাঁকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
অভিযানের দ্বিতীয় পর্যায়ে ধোজ থেকে চার কিলোমিটার দূরে ফতেহপুর তাগা গ্রামে এক মৌলানার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার হয় আরও ২,৫৬৩ কেজি বিস্ফোরক। আগেই ওই মৌলানাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সবমিলিয়ে হরিয়ানার দুই জায়গা থেকেই উদ্ধার হয়েছে প্রায় ২৯০০ কেজি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট— যা দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিস্ফোরক উদ্ধার বলে দাবি পুলিশের।
জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের বিবৃতি অনুযায়ী, গত পনেরো দিনের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাতজন —
আরিফ নিসার দার, ইয়াসির উল আশরফ, মকসুদ আহমেদ দার, ইমাম ইরফান আহমেদ, জামীর আহমেদ অহঙ্গার, মুজাম্মিল আহমেদ ও আদিল আহমেদ রাথের।
এখনও পর্যন্ত তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও কোনও আন্তর্জাতিক সংযোগ বা আর্থিক মদত রয়েছে কি না।
তদন্তে উঠে এসেছে, এই জঙ্গি মডিউলের মূল লক্ষ্য ছিল দিল্লি ও এনসিআর অঞ্চল।
বিস্ফোরণের মাধ্যমে প্রশাসনিক দফতর ও জনবহুল এলাকায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ছক কষা হয়েছিল। তাই বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে দিল্লি, গুরগাঁও, নয়ডা ও গাজিয়াবাদে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক এই ঘটনাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারতের মাটিতে সক্রিয়ভাবে পুনর্গঠিত হচ্ছে জঙ্গি নেটওয়ার্ক, যারা স্থানীয় ‘হোয়াইট কলার’ পেশাজীবীদের ব্যবহার করে নিরাপত্তার বলয় ভাঙার চেষ্টা করছে।
গোয়েন্দা সংস্থার দ্রুত পদক্ষেপে ফের একবার দেশের বড় বিপর্যয় এড়ানো গেল।
এই ঘটনায় প্রমাণ মিলল— জঙ্গিদের লক্ষ্য এখন কেবল সীমান্ত নয়, বরং সমাজের মূল কাঠামোতে ঢুকে পড়ে ভিতর থেকে আঘাত হানা।
দেশজুড়ে এখন সর্বোচ্চ সতর্কতা, বিশেষ করে দিল্লি, মুম্বই, কলকাতা, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।




