কলকাতা টাইমস নিউজ :নিজস্ব সংবাদদাতা :কলকাতা :১৩নভেম্বর
জেল থেকে বেরিয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টা। মুখ খুললেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়— এমনভাবে, যা গত সাড়ে তিন বছরে কেউ শোনেনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর অকপট স্বীকারোক্তি, “অর্পিতা আমার বান্ধবী, তাতে অসুবিধে কী আছে? অনেকেরই একাধিক বান্ধবী থাকে, আমার একটা বান্ধবী থাকতে পারে না?”
এই এক মন্তব্যেই যেন নড়ে গেল রাজ্যের রাজনৈতিক অন্দরের নিস্তব্ধতা।
২০২২ সালের জুলাই মাসে অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের দু’টি ফ্ল্যাট থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা নগদ ও সোনার গয়না উদ্ধার করেছিল ইডি। সেই থেকেই পার্থ ও তাঁর ঘনিষ্ঠ অর্পিতা আলোচনার কেন্দ্রে। শিক্ষায় নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন দু’জনেই। দীর্ঘ দিন জেলে থাকার পর অর্পিতা কিছুদিন আগেই জামিনে মুক্তি পান, আর মঙ্গলবার পার্থর মুক্তির পর থেকেই শুরু নতুন বিতর্ক।
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে পার্থ বলেন, “আমার বাড়ি থেকে তো টাকা পায়নি, পেয়েছে আমার বান্ধবীর বাড়ি থেকে। অর্পিতা আমার বান্ধবী, তাতে অসুবিধে কোথায়?”
এখানেই শেষ নয়, প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় ও বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদাহরণ টেনে পার্থ বলেন, “যদি শোভন–বৈশাখীকে মিডিয়া দেখাতে পারে, তাহলে আমাদেরও দেখাক!”
পার্থর দাবি, তৃণমূলের ভিতরে আরও অনেকেই আছেন যাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে এমন সম্পর্ক রয়েছে। নাম করে বলেন, “দলে অনেককে পাবেন, সৌগতদা আছেন, আরও অনেকে আছেন।”
এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে— পার্থ কি নিজের দায় ঝেড়ে দিতে চাইছেন, নাকি দলের শীর্ষস্তরে চাপ তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছেন?
যাঁকে ঘিরে এত বিতর্ক, সেই অর্পিতা মুখোপাধ্যায় অবশ্য শান্ত স্বরে বলেন, “যদি উনি আমাকে বান্ধবী ভাবেন, আমি তো বন্ধু বলে মানবই। এটা পরকীয়া নয়, বন্ধুত্ব অন্যায় নয়।”
অর্পিতার এই বক্তব্যে নতুন করে মানবিকতার ছোঁয়া যুক্ত হলেও, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন — “এই মন্তব্য আসলে এক ধরনের নৈতিক বৈধতা খোঁজার চেষ্টা।”
শোভন চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় পাল্টা বলেন, “তিনি (পার্থ) আগে যাঁকে ভাগ্নি বলে পরিচয় দিতেন, এখন তাঁকে বান্ধবী বলে স্বীকার করেছেন, এর জন্য সংগ্রামী অভিনন্দন।”
পার্থর নামোল্লেখে ক্ষুব্ধ সৌগত রায় বলেন, “ফালতু।” এক বাক্যেই তিনি বুঝিয়ে দেন, এই বিতর্কে তিনি থাকতে রাজি নন।
বেহালা পশ্চিমের বিধায়ক হিসেবে নিজের কাজের বিবরণ দিতে পার্থ প্রকাশ করেছেন একটি লিফলেট, যেখানে প্রশ্ন তুলেছেন, “চাকরির বদলে আমি কার কাছ থেকে অর্থ নিয়েছি?”
এবার নিজের কেন্দ্রেই তিনি চালু করতে চলেছেন “জনবাক্স”— যেখানে নাগরিকরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগ বা তথ্য জমা দিতে পারবেন।
বিধানসভায় ফেরার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন পার্থ। স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “উনি আসতে পারেন। সাধারণ বিধায়কের মতো সুযোগ সুবিধা পাবেন। আমি উপযুক্ত জায়গা করে দেব।”
রাজনীতিতে ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্বীকারোক্তি সচরাচর দেখা যায় না। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের এই অকপটতা অনেকেই দেখছেন ‘মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি’র চিহ্ন হিসেবে, আবার কেউ কেউ বলছেন — “এ এক নতুন রাজনৈতিক বার্তা।”
অভিযোগের পাহাড়, ইডির তদন্ত, দীর্ঘ তিন বছরের নীরবতা— সব শেষে ‘একটা বান্ধবী থাকতে পারে না?’ — এই প্রশ্নই যেন এখন রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।




