কলকাতা টাইমস নিউজ :নিজস্ব সংবাদদাতা :কলকাতা :১৩নভেম্বর
CLICK HERE TO WATCH 👆
বিস্তারিত ফাল্গুনী রায়চৌধুরীর কলমে :
সিনেমা কখনও শুধু রূপালি পর্দার আলো নয়, এটি এক অন্তর্গত ভাষা, যা হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিকে ছুঁয়ে যায়। তাই বলা যায়, চলচ্চিত্রই সেই শিল্প যেখানে জীবন নিজেই কথা বলে।
৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব যেন সেই জীবনের কথাই নতুন করে উচ্চারণ করল — যেখানে প্রযুক্তি, শিল্প, অনুভূতি, ও মানবতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
এই উৎসব শুধু পর্দার গল্প নয়, বরং এটি এক চলমান ইতিহাস, যেখানে প্রতিটি দেশ, প্রতিটি ভাষা ও প্রতিটি সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে কথোপকথনে মেতে ওঠে।
হিমালয়ের কোলে ফিরে যাওয়া — নেপালের পরিচালক ত্রিবেণী রাই-এর ‘Shape of Momo’
ভারতীয় সিনেমা প্রতিযোগিতা বিভাগে অন্যতম আকর্ষণ এই বছর ‘Shape of Momo’। নেপালের তরুণ পরিচালক ত্রিবেণী রাই—যিনি সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের প্রাক্তনী—তার ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছেন শিকড়ে ফেরা এক যুবকের গল্প।
হিমালয়ের ছোট্ট গ্রাম, মাটির গন্ধ, আর মায়ের স্নেহে ভরা এক আখ্যান মন জয় করেছে দর্শকদের।
‘নিংমা’ — আশার আলোয় আলোকিত পার্বত্য জীবন
লিটন পালের পরিচালনায় ‘Ningma’ যেন পাহাড়ের জীবনের প্রতিচ্ছবি।
তীব্র দারিদ্র্য, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই, আর আশার দীপ—সব মিলিয়ে এই ছবিটি মানুষের স্থিতিস্থাপকতার কাব্য।
যে তরুণ কঠিন বাস্তবতাকে অতিক্রম করে ভালোবাসা খুঁজে নেয়, সেই গল্পই এখানে জীবন হয়ে উঠেছে।
‘Whisper of the Mountains’ — পাহাড়ি চা দোকানির জীবনের রূপকথা
সহকারী পরিচালকের অভিজ্ঞতা থেকে নিজের প্রথম সিনেমা বানিয়ে ফেলেছেন জিগার নাগদা।
আরাবল্লী পাহাড়ের কোলে বসবাসকারী এক চা দোকানি ও তার ছেলের জীবনের গল্প যেন বাস্তবের এক মৃদু কবিতা।
মানুষের ছোট ছোট আশা, ভালোবাসা আর নীরব সংগ্রাম এই ছবিকে করেছে অনন্য।
‘Kabul Hai’ — আশার আলো জ্বালায় যে সিনেমা
পরিচালক জয় গড়েই-এর ‘Kabul Hai’ সমসাময়িক ভারতীয় সমাজে এক আলোর দিশা।
রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে এক নারীর শিক্ষা ও স্বপ্নের গল্পে জেগে ওঠে ভালোবাসা ও স্বাধীনতার সুর।
স্বামী মিলনের সহায়তায় বানুর স্বপ্ন পূরণের যাত্রা যেন আশার প্রতীক—এক মানবিক সিনেমা, যা দর্শকদের চোখে জল আনে, মনে আলো জ্বালায়।
রূপকলার ছাত্রছাত্রীদের নতুন যাত্রা
বুধবার ও বৃহস্পতিবার শিশির মঞ্চে প্রদর্শিত হবে রূপকলা কেন্দ্রের ছাত্রদের ১৩টি সিনেমা।
তরুণ পরিচালকদের চোখে দেখা পৃথিবী—কোথাও বিদ্যুৎহীন দ্বীপে একাকী মানুষের গল্প, কোথাও হারিয়ে যাওয়া তথ্যের অনুসন্ধান।
তরুণ প্রজন্মের ভাবনা ও প্রযুক্তির সংমিশ্রণ যেন ভবিষ্যৎ সিনেমারই ঝলক।
‘Eight’ — সাদাকালোয় রঙিন কলকাতা
বাংলা প্যানোরামা বিভাগে পরিচালক অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়ের ছবি ‘Eight’ এখন শহরের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
চলতি ধারা ভেঙে সম্পূর্ণ আইফোনে শ্যুট করা এই সিনেমা এক অভিনব উদ্যোগ।
পরিচালকের কথায়, “আমরা হারিয়ে ফেলছি সময় আর সংযোগ—আমি ক্যামেরাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে বুঝতে চেয়েছি নিজেকে।”
সাদাকালো ছবির মধ্যে আলো-ছায়ার যাত্রায় দর্শক যেন নিজেদের প্রতিচ্ছবিই খুঁজে পান।
‘ GETUP KINGSHUK ’ — হাসির আড়ালে জীবনের ব্যথা
তরুণ পরিচালক নন্দন ঘোষের সিনেমা Haasir Moroke হাসির আবরণে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতার এক নির্মম ছবি।
চার্লি চ্যাপলিনের প্রভাবিত শৈলীতে তিনি দেখিয়েছেন আধুনিক তরুণ সমাজের মানসিক যন্ত্রণা, ঘুমহীনতা, ও একাকীত্ব।
একই সঙ্গে হাসায়, আবার ভাবায়।
‘Anmol’ — ভালোবাসার কঠিন পরীক্ষা
পরিচালক প্রিয়াঙ্কা এস সাহা-র হিন্দি ছবি ‘Anmol’ মধ্যবিত্ত দম্পতির বাস্তব জীবনের গল্প।
অর্থনৈতিক চাপ, সন্তানের জন্মের পর সামাজিক সংকট—সব মিলিয়ে এই ছবিটি প্রতিটি পরিবারের মানসিক টানাপোড়েনের প্রতিচ্ছবি।
দর্শকদের কাছ থেকে ছবিটি পাচ্ছে উষ্ণ অভ্যর্থনা।
যুদ্ধ, নির্বাসন ও মানবতা
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও ধর্মীয় সংঘাতের ভয়াবহতা নিয়ে ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অন্যতম সেগমেন্ট।
কাজাখস্তানের পরিচালক নাতালিয়া উইটমারের Evacuation দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মা-মেয়ের বিচ্ছেদের কাহিনি তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে, জার্মান পরিচালক মাইকেল কোফলারের ছবিতে পলের মানবিকতার গল্প—যেখানে সন্ত্রাসের মাঝেও মানবতার আলো নিভে যায় না।
দর্শক-উন্মাদনা ও সিনেমা-প্রেম
উৎসবের শেষদিকে সকাল থেকেই দর্শকদের লাইন উপচে পড়ছে নন্দন ও শিশির মঞ্চে।
কেউ চেয়ার না পেয়ে মাটিতে বসেই সিনেমা দেখছেন, কেউ আবার সন্তানদের সঙ্গে সিনেমার আনন্দ ভাগ করছেন।
রাশিয়ান অভিনেত্রীর “জিমি জিমি আজা আজা” নাচে গোটা নন্দন প্রাঙ্গণ হাততালিতে মুখর।
এ যেন কলকাতার সিনেমা প্রেমের এক জীবন্ত দলিল — যেখানে চলচ্চিত্রই শেষ পর্যন্ত মানবতার সেতুবন্ধন।




