কলকাতা টাইমস নিউজ : নিজস্ব সংবাদদাতা : কলকাতা / গঙ্গাসাগর :১৬ জানুয়ারি ২০২৬
পুণ্যের জোয়ার থেমেছে। পয়লা মাঘের ভোরে শেষবারের মতো গঙ্গাসাগরের জলে ডুব দিয়ে প্রণাম সেরেছেন পুণ্যার্থীরা। বিকেল গড়াতেই ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করেছে সাগরতট। সাধু থেকে গৃহস্থ—সবারই একটাই লক্ষ্য, ঘরে ফেরা। আর ঠিক তখনই শুরু হল আরেক অধ্যায়—মেলার পরের বাস্তবতা, সাফাই অভিযান।
ভোরের আলো ফোটার আগেই বৃহস্পতিবার সাগরতটে ভিড় জমিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। ভিন রাজ্যের পুণ্যার্থী যেমন ছিলেন, তেমনই ছিলেন সাগরদ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দারাও। ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে এসেছিল প্রার্থনা, মানত আর বিশ্বাস। কিন্তু সূর্য একটু উঠতেই বদলে যায় ছবি—কাঁধে ব্যাগ, হাতে পুঁটলি, চোখে ক্লান্তি নিয়ে ফেরার প্রস্তুতি।
মেলা উপলক্ষে বসা বড় অস্থায়ী বাজার এখনও পুরোপুরি গুটিয়ে যায়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা শেষ হবে ১৭ তারিখে, তাই দোকানপাট থাকবে আরও কিছুদিন। এ দিন থেকেই শুরু হয়েছে গঙ্গাপুজো, যা চলবে প্রায় এক সপ্তাহ। তবে সাগরতটজুড়ে পড়ে আছে পুণ্যার্থীদের ব্যবহৃত পুজোর উপকরণ—মাটির হাঁড়ি, খড়, ফুল, জলের বোতল ও পাউচ। এই আবর্জনার স্তূপই এখন প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, শুক্রবার থেকেই জোরদার সাফাই অভিযান শুরু হচ্ছে। রাজ্যের মন্ত্রী ও আধিকারিকরা নিজেরাই মাঠে নেমে কাজ দেখবেন। এক সপ্তাহের মধ্যে সাগরতটকে আগের মতো পরিষ্কার করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সরকারি হিসাব জানায়, এ বছর গঙ্গাসাগর মেলায় রেকর্ড ১ কোটি ৩০ লক্ষ পুণ্যার্থী পুণ্যস্নান সেরেছেন। মেলার স্মৃতি ধরে রাখতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তৈরি ১৫টি ‘বন্ধন বুথ’ থেকে ১১ লক্ষ মানুষ ই-পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছেন।
নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাও ছিল উল্লেখযোগ্য। হারিয়ে যাওয়া ৬৬৩২ জনের মধ্যে ৬৬২৭ জনকে পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ছিনতাই ও পকেটমারির অধিকাংশ অভিযোগেই উদ্ধার হয়েছে খোয়া যাওয়া সামগ্রী। অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে ৮৮৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মেলার ২ নম্বর রাস্তার ধারে বজরঙ্গ পরিষদের আশ্রয় শিবিরে বৃহস্পতিবার সকালে দেখা গেল অন্য ছবি। টিফিন হাতে নিয়ে বসে আছেন পথ হারানো মানুষজন। কেউ খাচ্ছেন, কেউ কথা বলতে গিয়েই ভেঙে পড়ছেন কান্নায়। পুলিশ প্রশাসন ও হ্যাম রেডিও-র সহায়তায় নাম-ঠিকানা ধরে একের পর এক ঘোষণা চলেছে বিভিন্ন ভাষায়। তবু এখনও শিবিরে রয়ে গিয়েছেন প্রায় ৪০০ জন পুণ্যার্থী।
৬২ বছরের বিমলা কয়াল কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “বোনের সঙ্গে হাওড়ার শ্যামপুর থেকে এসেছিলাম। স্নান সেরে উঠেই আর খুঁজে পাইনি।”
৭০ বছরের লালমনি কুঙার বিহারের ঔরঙ্গবাদ থেকে এসে দলছুট হয়েছিলেন—শেষমেশ উদ্ধার করেন শিবিরের স্বেচ্ছাসেবীরা।
আর ঝাড়খণ্ড থেকে আসা ৭২ বছরের সারথি মাহাতো—তাঁকে খুঁজতে দিনভর শিবিরের অফিসে বসে ছিলেন স্বামী। সন্ধ্যা নেমেছে, এখনও মেলেনি খোঁজ।
গঙ্গাসাগর মেলা শেষ মানেই শুধু পুণ্যের অধ্যায় বন্ধ হওয়া নয়। শুরু হয় ফেরার যাত্রা, অপেক্ষা, কান্না আর আশার গল্প। একদিকে সাফাই অভিযানে ফিরবে সাগরতটের সৌন্দর্য, অন্যদিকে আশ্রয় শিবিরে চলবে মানুষের ঘরে ফেরার লড়াই। পুণ্যের ঢেউ থামলেও, মানুষের গল্প থামে না।




