কলকাতা টাইমস নিউজ : নিউজ ডেস্ক : কলকাতা :৩১ জানুয়ারি ২০২৬
এশিয়ার একাধিক দেশে ফের সতর্কবার্তা। পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসে অন্তত দু’জনের মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর-সহ বহু দেশ বিমানবন্দর ও সীমান্তে শুরু করেছে কড়া স্ক্রিনিং ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা। কারণ একটাই—নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায় এবং মৃত্যু হার ৪০% থেকে ৭৫% পর্যন্ত হতে পারে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও চিন্তায় ফেলেছে।
কিন্তু এই নিপাহ ভাইরাস আসলে কী? কীভাবে ছড়ায়? কতটা বিপজ্জনক? চিকিৎসা বা টিকা আছে কি? সাধারণ মানুষেরই বা কতটা চিন্তা করা উচিত? বিস্তারিত জানানো হল।
নিপাহ একটি জুনোটিক ভাইরাস, অর্থাৎ যা প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এটি ‘হেনিপা ভাইরাস’ (Henipavirus) পরিবারের সদস্য, একই পরিবারের আরেকটি ভাইরাস হল ‘হেন্দ্রা’। প্রথমবার ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায় এর প্রাদুর্ভাব ধরা পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাদুড় এই ভাইরাসের প্রধান বাহক। সেখান থেকেই মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটে।
কীভাবে ছড়ায় সংক্রমণ?
নিপাহ সংক্রমণের প্রধান তিনটি পথ রয়েছে—
১. প্রাণী থেকে মানুষে
সংক্রমিত বাদুড়ের লালা, মূত্র বা মলের সংস্পর্শে এলে ভাইরাস ছড়াতে পারে। মালয়েশিয়ায় প্রথম দফায় শূকরের মাধ্যমেও ছড়িয়েছিল।
২. দূষিত খাবার থেকে
খেজুরের রস বা খেজুরের পাম স্যাপ যদি বাদুড়ের দেহরস দ্বারা দূষিত হয়, তা পান করলে সংক্রমণ হতে পারে।
৩. মানুষ থেকে মানুষে
রোগীর খুব কাছাকাছি থাকা, পরিচর্যা করা, হাসপাতাল বা বাড়িতে সংক্রমিত শরীরের নিঃসরণে সংস্পর্শ—এইভাবে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। যদিও এই পথ তুলনামূলক কম সাধারণ।
উপসর্গ কত দিনে দেখা দেয়?
সংক্রমণের ৪ দিন থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। নিপাহের বড় বিপদ হল—এটি খুব দ্রুত গুরুতর আকার নিতে পারে।
কী কী লক্ষণ দেখা যায়?
প্রথমে সাধারণ জ্বরের মতো মনে হলেও দ্রুত অবস্থা খারাপ হয়।
প্রধান উপসর্গ—
-
জ্বর
-
তীব্র মাথাব্যথা
-
শ্বাসকষ্ট
-
খিঁচুনি
-
অচেতন হয়ে পড়া
-
হাত-পা নাড়াতে না পারা
-
শরীরের অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি
-
আচরণগত পরিবর্তন বা মানসিক বিভ্রান্তি
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হল এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কে প্রদাহ)। এর ফলে অনেক রোগীর মৃত্যু হয়। এমনকি যারা সুস্থ হয়ে যান, তাঁদের মধ্যে বহু বছর পর আবার ‘রিল্যাপ্স এনসেফালাইটিস’ দেখা দিতে পারে।
নিপাহ সরাসরি ফুসফুস ও মস্তিষ্কে আঘাত হানে। নিউমোনিয়া ও ব্রেন ইনফ্লেমেশন একসঙ্গে হওয়ায় রোগীর অবস্থা দ্রুত সংকটজনক হয়ে ওঠে। তাই মৃত্যু হার ৪০%–৭৫% পর্যন্ত।
এই মুহূর্তে নিপাহের নির্দিষ্ট কোনও টিকা বা ওষুধ নেই।
তবে অস্ট্রেলিয়ায় m102.4 নামে একটি চিকিৎসা পদ্ধতির ট্রায়াল চলছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ভালো ফল মিললেও এটি এখনও পরীক্ষামূলক। তাই সাধারণ মানুষের জন্য এখনও কার্যকর চিকিৎসা উপলব্ধ নয়।
বর্তমানে শুধু উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা, আইসোলেশন ও নিবিড় পরিচর্যাই ভরসা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—নিপাহ মারাত্মক হলেও এটি কোভিডের মতো দ্রুত মানুষে-মানুষে ছড়ায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাণী বা দূষিত খাবারের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটে।
তাই আক্রান্ত এলাকা ছাড়া ঝুঁকি কম। তবে সতর্ক থাকা জরুরি।
সতর্কতা কীভাবে নেবেন?
-
কাঁচা খেজুরের রস বা খোলা খাবার এড়িয়ে চলুন
-
বাদুড় বা অসুস্থ প্রাণীর সংস্পর্শ এড়ান
-
আক্রান্ত এলাকায় গেলে মাস্ক ব্যবহার করুন
-
অসুস্থ হলে ভ্রমণের ইতিহাস চিকিৎসককে জানান
-
হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বিধি মানুন
প্রতিবার নতুন ভাইরাসের খবর এলেই আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপাহকে গুরুত্ব দিয়ে নজরে রাখা প্রয়োজন, কিন্তু অযথা আতঙ্ক নয়। সতর্কতা ও সচেতনতা থাকলেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্যবিধি মানলেই সুরক্ষা—এই বার্তাই দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।




