spot_img
35 C
Kolkata
Tuesday, May 19, 2026
spot_img

মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি যুদ্ধ! ইরানের পাল্টা হামলায় তেল–গ্যাস কেন্দ্র টার্গেট, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা !

কলকাতা টাইমস নিউজ  : কলকাতা :২১ মার্চ ২০২৬

 

 দেবজিৎ গাঙ্গুলী :

ধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নতুন মোড় নিয়েছে। সামরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি এবার জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে এক নতুন কৌশলগত লড়াই। ১৮ মার্চ ইরান একাধিক উপসাগরীয় দেশে জ্বালানি কেন্দ্রগুলিতে হামলা চালিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কাতারের বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস হাব থেকে শুরু করে সৌদি আরব ও কুয়েতের তেল শোধনাগার—সবই পরিণত হয়েছে এই সংঘাতের লক্ষ্যবস্তুতে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় ইজরায়েলের তরফে ইরানের একটি গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পর। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা আঘাত হানে তেহরান। শুধু একটি হামলা নয়, ধারাবাহিকভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিকাঠামোকে নিশানা করা হয়। সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের একটি তেল শোধনাগারে হামলা এবং কুয়েতের দুটি রিফাইনারিতে আগুন লাগার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা অঞ্চলে।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হামলা নিছক প্রতিশোধ নয়, বরং সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ। ইরান একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিজের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করতে চাইছে, তেমনই দেশের অভ্যন্তরে শক্ত অবস্থানও বজায় রাখতে চাইছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলির পাশাপাশি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামোর উপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণও চালানো হয়েছে। এই হামলাগুলিতে এখনও পর্যন্ত সাতজন মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

এই ধারাবাহিক আক্রমণের মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে—তারা শুধু প্রতিরক্ষায় নয়, আক্রমণেও সমানভাবে সক্ষম। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী এবং প্রশাসনিক কাঠামোর কাছে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করাও এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ, যদি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর আস্থা কমে যায়, তাহলে বিদ্রোহ বা অস্থিরতা দমন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

ইরানের এই কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য উপসাগরীয় দেশগুলিকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলা। কাতার, সৌদি আরব বা কুয়েত—এই দেশগুলির অর্থনীতি ব্যাপকভাবে নির্ভর করে তেল ও গ্যাস রপ্তানির উপর। এই অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের আয় কমে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে রাষ্ট্রীয় নীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান চাইছে এই দেশগুলি যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্বিবেচনা করে।

এই সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যেই অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুমান, যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলির জিডিপি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে তেলের দামও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৬৮ ডলার থেকে প্রায় ১০০ ডলারে পৌঁছে গিয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বজুড়ে এর প্রতিক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে। তেল নির্ভর দেশগুলিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও অফিসে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ চালু হচ্ছে, কোথাও আবার সাধারণ মানুষের জন্য আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ ঘোষণা করা হচ্ছে। ফলে এই সংঘাত এখন আর শুধুমাত্র আঞ্চলিক সীমায় আবদ্ধ নেই, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির উপর চাপ তৈরি করছে।

এদিকে ইরানের আরেকটি কৌশলগত লক্ষ্য হল বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উপর এই চাপ বাড়ানোই তাদের উদ্দেশ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইতিমধ্যেই আমেরিকায় জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব পড়ছে, যা রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন শুধু সামরিক লড়াই নয়, বরং জ্বালানি ও অর্থনীতির এক জটিল যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। ইরানের ধারাবাহিক হামলা এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সংঘাত দ্রুত থামার সম্ভাবনা কম। বরং এই কৌশলগত আঘাতের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী চাপ বাড়িয়ে পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান।

Related Articles

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
22,800SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles

Enable Notifications Thank You No thanks