কলকাতা টাইমস নিউজ : নিউজ ডেস্ক : কলকাতা :২৫ মার্চ ২০২৬
বিধানসভা নির্বাচনের আগে ফের মাথাচাড়া দিল বহুদিনের এক পুরনো বিতর্ক—রাস্তায় দাঁড় করিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি কি পুলিশ ভোটের কাজে ‘দখল’ করতে পারে? সামাজিক মাধ্যমে অভিনেতা অরিত্র দত্ত বণিকের এক পোস্ট ঘিরে এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে, আর সেই সঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে কলকাতা হাইকোর্টের ২০০৬ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়।
মঙ্গলবার সকালে ডানলপ এলাকা থেকে নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ফেরার সময় পুলিশ তাঁর গাড়িটি ভোটের কাজে ব্যবহারের জন্য নিতে চায় বলে অভিযোগ করেন অরিত্র। তাঁর হাতে একটি রিকুইজিশন স্লিপও ধরানো হয় বলে দাবি। এই ঘটনার পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন তোলেন তিনি—কোন আইনে ব্যক্তিগত গাড়ি এভাবে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে নিয়ে নেওয়া যায়? সাধারণ মানুষও একই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন—নিজের গাড়ি নিয়ে বেরোলেই কি তা যে কোনও মুহূর্তে প্রশাসন অধিগ্রহণ করতে পারে?
এই বিতর্কের প্রেক্ষিতেই সামনে আসছে ২০০৬ সালে কলকাতা হাইকোর্টের একটি রায়। তৎকালীন বিচারপতি গিরিশচন্দ্র গুপ্ত একটি মামলার রায়ে স্পষ্ট করেছিলেন, ভোটের কাজে গাড়ি নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। মোটর ভেহিকলস আইনের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ি অধিগ্রহণের দায়িত্ব জেলাশাসকের, পুলিশের নয়।
রায়ে বলা হয়েছিল, কোনও ব্যক্তিগত গাড়ি যদি ভোটের কাজে প্রয়োজন হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট জেলাশাসককে নির্দিষ্টভাবে সেই গাড়ির নম্বর উল্লেখ করে রিকুইজিশন জারি করতে হবে এবং তা সরাসরি মালিকের কাছে পাঠাতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট দিনে গাড়ির মালিক বা সরকারি চালকের মাধ্যমে সেই গাড়ি নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার কথা। অর্থাৎ, রাস্তায় দাঁড় করিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ি ‘দখল’ করার কোনও বিধান নেই।
আইনজীবীদের মতে, বর্তমানে যেভাবে ছাপানো ফর্মে পুলিশ রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে রিকুইজিশন স্লিপ দিয়ে অধিগ্রহণ করে, তা আইনসিদ্ধ নয়। তাঁরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত হোক বা বাণিজ্যিক—কোনও গাড়িই পুলিশ সরাসরি রাস্তায় দাঁড়িয়ে দখল নিতে পারে না। তবে এই রায়ে ব্যক্তিগত গাড়ি আদৌ নেওয়া যাবে কি না, সে বিষয়ে কিছুটা আইনি ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবার নির্বাচনের আগে এই ইস্যুতে উদ্বেগ বাড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। অনেক গাড়ির মালিকই আশঙ্কায় নিজের জেলার বাইরে গাড়ি নিয়ে যেতে চান না। তাঁদের অভিজ্ঞতা, একবার গাড়ি রিকুইজিশন হয়ে গেলে ভোটের আগে নির্দিষ্ট থানায় জমা দিতে হয় এবং কয়েক দিন তা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা হয়। ফলে ব্যক্তিগত কাজে বড় অসুবিধায় পড়তে হয় মালিকদের।
অন্যদিকে, রাজ্য পুলিশের এক শীর্ষকর্তা জানিয়েছেন, নির্বাচনের সময়ে পুলিশ ও প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের অধীনেই কাজ করে। সেই কারণে ভোট পরিচালনার প্রয়োজন অনুযায়ী গাড়ি বাছাই করা হয় এবং তা সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই করা হয় বলে দাবি প্রশাসনের।
তবে বাস্তবে আইনের প্রয়োগ কতটা সঠিকভাবে হচ্ছে, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। ২০০৬ সালের হাইকোর্টের রায় সামনে এনে অনেকেই দাবি করছেন, ব্যক্তিগত গাড়ি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন যত এগোচ্ছে, ততই এই ইস্যুতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনের সঠিক প্রয়োগ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতাই এখন এই বিতর্কের সমাধান করতে পারে—এমনটাই মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।




