কলকাতা টাইমস নিউজ : কলকাতা :০৩ এপ্রিল ২০২৬
দেবজিৎ গাঙ্গুলী :
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির আড়ালে চাপা পড়ে গেলেও দক্ষিণ এশিয়ায় নীরবে জ্বলছে আরেকটি সংঘাতের আগুন। গত প্রায় এক মাস ধরে Pakistan এবং Taliban সরকারের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ চলছে, যা ক্রমশ জটিল আকার নিচ্ছে। বহুদিনের ‘ঘনিষ্ঠ’ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এই দুই শক্তির মধ্যে এমন সংঘাত কেন—তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে আন্তর্জাতিক মহলে।
সংঘাতের সূত্রপাত সাম্প্রতিক নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অবিশ্বাস, কৌশলগত দ্বন্দ্ব এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সমস্যা থেকেই এই পরিস্থিতির জন্ম। বিশেষ করে Tehrik-i-Taliban Pakistan বা টিটিপি-র ভূমিকা এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তানের মাটিতে আশ্রয় নিয়ে টিটিপি তাদের দেশে একাধিক হামলা চালাচ্ছে। অথচ তালিবান সরকার সেই জঙ্গি সংগঠনকে দমন করার বদলে কার্যত আশ্রয় দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান শুরু করে সীমান্তবর্তী এলাকায় বিমান হামলা। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়, যখন পাকিস্তান শুধু টিটিপি নয়, সরাসরি তালিবান লক্ষ্য করেও আক্রমণ চালাতে শুরু করে। তার পাল্টা জবাবে তালিবান যোদ্ধারাও সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ফলে এই সংঘাত এখন কার্যত দুই রাষ্ট্রীয় শক্তির মধ্যে যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।
তবে এই দ্বন্দ্বের শিকড় আরও গভীরে। একসময় তালিবানকে পাকিস্তানের ‘প্রক্সি’ হিসেবে দেখা হলেও বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। তালিবান মূলত আফগানিস্তানের পাস্তুন সমাজের ভিত থেকে উঠে আসা একটি শক্তি, যাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও ধর্মীয় লক্ষ্য রয়েছে। তারা পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল মূলত মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে টিকে থাকার কৌশল হিসেবে। কিন্তু সেই সময় থেকেই পাকিস্তানের প্রতি তাদের ক্ষোভ জমতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর পাকিস্তান যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করে তালিবান নেতাদের ধরিয়ে দেয়, তখন থেকেই সম্পর্কের ফাটল শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে তালিবানের বহু শীর্ষ নেতা নিহত হন, যার দায়ও তারা পাকিস্তানের উপর চাপায়। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর সেই পুরনো ক্ষোভই নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হতে শুরু করে।
এরই মধ্যে তালিবান তাদের অর্থনীতি ও বাণিজ্য নীতিতেও পরিবর্তন আনে। পাকিস্তানের উপর নির্ভরতা কমিয়ে তারা Iran–এর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ায় এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে India–কে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে তুলে ধরে। ফলে ইসলামাবাদের প্রভাব ক্রমশ কমতে থাকে।
অন্যদিকে, এই সংঘাতকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থেও ব্যবহার করছে তালিবান। তারা আফগান জনগণের কাছে নিজেদের ‘জাতীয় সার্বভৌমত্বের রক্ষক’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াইকে তারা এক ধরনের জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় সংগ্রাম হিসেবে প্রচার করছে, যা নতুন যোদ্ধা নিয়োগেও সহায়ক হচ্ছে।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক কূটনীতি। একদিকে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের মিত্র China এই পরিস্থিতিতে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে তালিবানের যোগাযোগ নিয়েও নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ফলে এই যুদ্ধ শুধুমাত্র সীমান্ত সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো সংঘাতের সম্ভাব্য বিস্তার। পাকিস্তান একটি পরমাণু শক্তিধর দেশ। সেখানে যদি অস্থিরতা বাড়ে, তবে তার প্রভাব গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তায় পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে আরও বড় সংঘর্ষের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তান ও তালিবানের এই সংঘাত শুধু দুই পক্ষের লড়াই নয়, বরং বহুস্তরীয় রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক এবং কৌশলগত দ্বন্দ্বের ফল। আপাতত নজর সবার—এই সংঘাত কোথায় গিয়ে থামে, আর তার প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়।
Key Phrases:
, TTP insurgency Pakistan, Afghanistan Pakistan tensions, South Asia geopolitics, Taliban vs Pakistan war
Description:
Tags:




