কলকাতা টাইমস নিউজ : নিউজ ডেস্ক : কলকাতা :22 এপ্রিল ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে একক সমীকরণে ফেলা যায় না—এই বাস্তবতা বারবার সামনে এসেছে। গোটা রাজ্য এক ছাঁচে ভোট দেয় না, বরং অঞ্চলভেদে রাজনৈতিক আচরণ, সামাজিক সমীকরণ এবং ভোটের ধরণ বদলে যায়। তাই নির্বাচনের ফলাফল বুঝতে গেলে রাজ্যকে ভাগ করে দেখতে হয় উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল, দক্ষিণবঙ্গের গ্রামীণ এলাকা, শহুরে বেল্ট এবং সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রবণতা, সংগঠনের শক্তি এবং ভোটের সম্ভাব্য ওঠানামা ধরে একটি সম্ভাব্য চিত্র এখনই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
উত্তরবঙ্গের রাজনীতি বরাবরই আলাদা চরিত্র বহন করে। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, দার্জিলিং এবং উত্তর দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় গত কয়েক বছরে বিজেপির প্রভাব লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে রাজবংশী এবং পাহাড়ি জনভিত্তিতে তাদের প্রভাব এখনও দৃঢ়। এই অঞ্চলে বিজেপি এগিয়ে থাকতে পারে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। হিসাব বলছে, এখানে বিজেপি প্রায় ২৮ থেকে ৩৮টি আসন পেতে পারে, যেখানে তৃণমূলের সম্ভাবনা ১৫ থেকে ২৫টির মধ্যে। কংগ্রেস এবং Communist Party of India (Marxist) মিলিয়ে পেতে পারে ২ থেকে ৬টি আসন। তবে বিজেপি তাদের সংগঠন কতটা ধরে রাখতে পারে, সেটাই হবে নির্ধারক।
অন্যদিকে জঙ্গলমহল—পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর ও বাঁকুড়ার বিস্তীর্ণ এলাকা—একসময় বিজেপির উত্থানের কেন্দ্রবিন্দু হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে তৃণমূল কিছুটা জমি ফিরে পেয়েছে। এই অঞ্চলে আদিবাসী ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, এবং সেই ভোটের দিকেই নজর সব দলের। সম্ভাব্য চিত্র অনুযায়ী, এখানে তৃণমূল ১৮ থেকে ২৬টি আসনে এগিয়ে থাকতে পারে, বিজেপি পেতে পারে ১২ থেকে ২০টি আসন এবং বাম-কংগ্রেস মিলিয়ে ২ থেকে ৫টি আসন পেতে পারে।
দক্ষিণবঙ্গের গ্রামীণ এলাকা—যার মধ্যে রয়েছে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলি, হাওড়ার গ্রামীণ অংশ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা—এই অঞ্চলই কার্যত রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্র নির্ধারণ করে। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প এবং সংগঠনের গভীর প্রভাব এখানে তাদের এগিয়ে রাখে। এই অঞ্চলে তৃণমূল ৭৫ থেকে ৯৫টি আসন পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে, বিজেপি পেতে পারে ২০ থেকে ৩৫টি আসন এবং বাম-কংগ্রেসের ভাগে যেতে পারে ৫ থেকে ১৫টি আসন। নির্বাচন জিততে গেলে এই অঞ্চলেই বড় লড়াই জিততে হয়—এটাই রাজনৈতিক বাস্তবতা।
শহুরে ভোটের চরিত্র আবার আলাদা। কলকাতা, হাওড়ার কিছু অংশ এবং বিধাননগর মিলিয়ে প্রায় ৪৫টি আসনের এই শহুরে বেল্টে মধ্যবিত্ত ভোটারদের মনোভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে তৃণমূলের প্রভাব বেশি থাকলেও বিজেপিরও কিছু নির্দিষ্ট ঘাঁটি রয়েছে। সম্ভাব্য হিসাবে তৃণমূল ৩০ থেকে ৩৮টি আসন পেতে পারে, বিজেপি ৫ থেকে ১২টি এবং বাম-কংগ্রেস ২ থেকে ৫টি আসন পেতে পারে। শহুরে অসন্তোষ বা সমর্থন—দুটিই এখানে দ্রুত ফলাফলে প্রভাব ফেলে।
সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলগুলির রাজনৈতিক সমীকরণও আলাদা। মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার কিছু অংশে দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে, যদিও কংগ্রেস কিছু জায়গায় নিজেদের জমি ধরে রেখেছে। এখানে সংখ্যালঘু ভোটের একত্রীকরণ ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেয়। হিসাব অনুযায়ী, তৃণমূল ২২ থেকে ২৮টি আসন পেতে পারে, কংগ্রেস ৫ থেকে ১০টি, বিজেপি ২ থেকে ৬টি এবং বাম দলগুলি ০ থেকে ৩টি আসনে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
এই সমস্ত অঞ্চল মিলিয়ে রাজ্যের মোট ২৯৪টি আসনের একটি সম্ভাব্য সামগ্রিক চিত্র দাঁড়াচ্ছে—তৃণমূল কংগ্রেস ১৭০ থেকে ২১০টি আসনের মধ্যে থাকতে পারে, বিজেপি ৭০ থেকে ১১০টি আসন পেতে পারে, কংগ্রেস ৮ থেকে ১৮টি এবং Communist Party of India (Marxist) ৩ থেকে ১০টি আসনের মধ্যে থাকতে পারে।
সমস্ত বিশ্লেষণের শেষে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—Mamata Banerjee-র নেতৃত্বে তৃণমূল এখনও গ্রামীণ ও সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে এগিয়ে থাকায় একটি কাঠামোগত সুবিধা ধরে রেখেছে। বিজেপির ভরসা মূলত উত্তরবঙ্গ এবং কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে ভোটের সংহতি তৈরি করা। অন্যদিকে বাম ও কংগ্রেস যদি তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে, তাহলেই তারা ফলাফলে বাস্তবিক ভূমিকা নিতে পারবে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন যত এগোবে, এই সমীকরণ আরও বদলাতে পারে। তবে আপাতত অঞ্চলভিত্তিক এই চিত্রই ইঙ্গিত দিচ্ছে—লড়াই একতরফা নয়, বরং বহুস্তরীয় এবং জটিল।




