কলকাতা টাইমস নিউজ : নিউজ ডেস্ক : কলকাতা :২৪এপ্রিল ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফাতেই যেন তৈরি হল নতুন রাজনৈতিক ইতিহাস। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোটদানের হার ছুঁয়ে ফেলল প্রায় ৯০ শতাংশ—যা এই রাজ্যের নির্বাচনী পরিসংখ্যানে এক অভূতপূর্ব রেকর্ড। Election Commission of India-র প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় ভোট হওয়া ১৫২টি কেন্দ্রে গড় উপস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮৯.৯৩ শতাংশ। শেষ মুহূর্তের ভোটারদের হিসাব যুক্ত হলে এই হার আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করছেন নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকরা।
রাজ্যের রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও হাই-প্রোফাইল কেন্দ্রগুলির মধ্যে অন্যতম Nandigram-এ ভোটদানের হার পৌঁছেছে প্রায় ৯০.৩ শতাংশে। এই কেন্দ্র বরাবরই রাজনৈতিক উত্তাপের কেন্দ্রে থাকে, আর এবারের এই বিপুল ভোটদানের হার সেই উত্তেজনাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
বাংলায় উচ্চ ভোটদানের ঐতিহ্য নতুন নয়। ১৯৯৬ সালে ভোটের হার ছিল প্রায় ৮৩ শতাংশ, ২০০১-এ তা কিছুটা কমে ৭৫ শতাংশে নেমে এলেও ২০০৬ সালে আবার ৮০ শতাংশে পৌঁছে যায়, তখন রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল CPI(M) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার, মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন Buddhadeb Bhattacharjee। এরপর ২০১১ সালের নির্বাচনে, যখন Mamata Banerjee-র নেতৃত্বে Trinamool Congress ক্ষমতায় আসে, তখন ভোটের হার উঠে যায় ৮৪ শতাংশে। ২০১৬ ও ২০২১ সালের নির্বাচনেও এই হার ৮২ শতাংশের আশপাশেই ছিল। তবে এবারের প্রায় ৯০ শতাংশ উপস্থিতি সেই সমস্ত রেকর্ডকে কার্যত ভেঙে দিয়েছে।
এই নজিরবিহীন উত্থানের পেছনে কী কারণ? নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, অন্যতম বড় ভূমিকা নিয়েছে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা SIR প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত, ডুপ্লিকেট এবং অযোগ্য ভোটারদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অনেক কেন্দ্রে ২০ থেকে ৩০ হাজার পর্যন্ত নাম মুছে ফেলা হয়েছে, বিশেষত মুর্শিদাবাদ ও মালদার মতো জেলায় এই সংখ্যা আরও বেশি। ফলে মোট ভোটারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভোটদানের শতাংশ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।
তবে শুধু পরিসংখ্যানগত পরিবর্তনই নয়, মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহও এই বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। SIR-এর সময় নতুন করে যাচাইয়ের প্রক্রিয়া অনেক ভোটারকে পুনরায় সক্রিয় করেছে। পাশাপাশি মহিলা ভোটার এবং প্রথমবার ভোটদাতাদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা এই উচ্চ উপস্থিতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
এই বিপুল ভোটদানের রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও শুরু হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। শাসক Trinamool Congress এই ভোটকে তাদের উন্নয়নমূলক প্রকল্প—‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ও ‘যুব সাথী’র প্রতি জনসমর্থনের প্রতিফলন বলে মনে করছে। অন্যদিকে বিরোধী Bharatiya Janata Party-র দাবি, এই বিপুল ভোটদানের হারই প্রমাণ করে যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে রাজ্যে, এবং মানুষ বর্তমান সরকারের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করতেই বড় সংখ্যায় ভোট দিতে বেরিয়েছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলায় বরাবরই তিনটি বিষয় উচ্চ ভোটদানের পেছনে কাজ করে—মজবুত বুথস্তরের সংগঠন, ভোটকে ঘিরে জনসাধারণের উৎসাহ এবং তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এবারের নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, শুধুমাত্র উচ্চ ভোটদানের হার থেকেই ফলাফল অনুমান করা যায় না। এটি বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রতিফলন। এখন দেখার, আগামী ৪ মে ফলাফল ঘোষণার দিনে এই বিপুল ভোটদান কি স্থিতাবস্থাকে বজায় রাখবে, নাকি নিয়ে আসবে এক নতুন রাজনৈতিক পালাবদল।




